ইসলাম কি ? ইসলামের সূচনা

                            আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ ওয়া বারাকাতুহু।

 

ইসলাম শব্দটির অর্থ হলআত্মসমর্পণ করা” ,“হুকুম মান্য করা”, “কোন আপত্তি ছাড়াই আদেশ-নিষেধ মেনে চলা”, “কেবলমাত্র আল্লাহ্রাব্বুলআলামীনের ইবাদত করা , তিনি যা বলেছেন তার সবকিছুই বিশ্বাস করা এবং তাঁর উপরেই বিশ্বাস এবং আস্থা রাখা। প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (সাল্লালাহুআলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাদের জন্য যে জীবন ব্যবস্থা নিয়ে এসেছিলেন তার নামই হলইসলাম।মুসলমানরা বিশ্বাস করে আদিকাল থেকেই অর্থাৎ প্রথম মানব আদমের সময় থেকেই ইসলাম ধর্মের প্রচলন শুরু হয়।

 





ইসলামের সূচনা- হযরত আদম()

মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। আল্লাহ তায়ালা মানুষ সৃষ্টি করেছেন। বিশ্ব ইতিহাসে প্রথম মানুষ প্রথম নবী হযরত আদম() ।হযরত আদম() কে আল্লাহ তায়ালা মাটি থেকে নিজ হাতে সৃষ্টি করেছেন এবং তার মধ্যে রুহ দিয়েছেন।মানুষ সমস্ত সৃষ্টিকুলের মধ্যে সুন্দর আকার আকৃতি দ্বারা গঠিত।অতঃপর আদমের পাঁজর থেকে তাঁর স্ত্রী হাওয়াকে সৃষ্টি করেন। আর কারণেই স্ত্রী জাতি স্বভাবগত ভাবেই পুরুষ জাতির অনুগামী পরস্পরের প্রতি আকৃষ্ট। অতঃপর স্বামী-স্ত্রীর মাধ্যমে যুগ যুগ ধরে একই নিয়মে মানববংশ বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রয়েছে। কুরআন-এর বর্ণনা অনুযায়ী প্রথম দিন থেকেই মানুষ পূর্ণ চেতনা জ্ঞান সম্পন্ন সভ্য মানুষ হিসাবেই যাত্রারম্ভ করেছে এবং আজও সেভাবেই তা অব্যাহত রয়েছে।

অতএব গুহামানব, বন্যমানব, আদিম মানব ইত্যাদি বলে অসভ্য যুগ থেকে সভ্য যুগে মানুষের উত্তরণ ঘটেছে বলে কিছু কিছু ঐতিহাসিক যেসব কথা শুনিয়ে থাকেন, তা অলীক কল্পনা ব্যতীত কিছুই নয়। সূচনা থেকে এযাবত এই দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় মানুষ কখনোই মানুষ ব্যতীত অন্য কিছু ছিল না। মানুষ বানর বা উল্লুকের উদ্বর্তিত রূপ বলে ঊনবিংশ শতাব্দীতে এসে চার্লস ডারউইন (যেবিবর্তনবাদ’ (Theory of Evolution) পেশ করেছেন, তা বর্তমানে একটি মৃত মতবাদ মাত্র এবং তা প্রায় সকল বিজ্ঞানী কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হয়েছে।

 

 

 

 

প্রথম মানুষ আদি পিতা আদম (আঃ)-কে আল্লাহ সর্ব বিষয়ের জ্ঞান যোগ্যতা দান করেন এবং বিশ্বে আল্লাহর খেলাফত পরিচালনার মর্যাদায় অভিষিক্ত করেন। সাথে সাথে সকল সৃষ্ট বস্ত্তকে করে দেন মানুষের অনুগত সবকিছুর উপরে দেন মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব ,আর সেকারণেই জিন-ফিরিশতা সবাইকে মানুষের মর্যাদার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্য আদমকে সিজদা করার আদেশ দেন। সবাই সে নির্দেশ মেনে নিয়েছিল। কিন্তু ইবলীস অহংকার বশে সে নির্দেশ অমান্য করায় চিরকালের মত অভিশপ্ত হয়ে যায় অথচ সে ছিল বড় আলেম ইবাদতগুযার।

 

আল্লাহ ফেরেশতাদের বললেন, আমি পৃথিবীতে আমার একজন প্রতিনিধি প্রেরণের ইচ্ছা করছি। ফেরেশতারা বলল, ‘হে আল্লাহ! আপনি পৃথিবীতে এমন সম্প্রদায়কে প্রতিনিধি বানাতে চাচ্ছেন, যারা মন্দ কাজ করবে এবং রক্তপাত ঘটাবে। আমরাই তো আপনার প্রশংসা করার সঙ্গে সঙ্গে আপনার তাসবিহ পাঠ করছি এবং পবিত্রতা বর্ণনা করছি।ফেরেশতাদের কথা শুনে আল্লাহ তাআলা বললেন, আমি যা জানি, তোমরা তা জানো না। (সুরা বাকারা, আয়াত: ৩০) আল্লাহ হজরত আদম (.)-কে বললেন, ‘তুমি তোমার স্ত্রী জান্নাতে থাকো। যা ইচ্ছা খাও।এরপর বিশেষ একটি গাছ দেখিয়ে আল্লাহ বললেন, ‘তোমরা এর কাছেও যাবে না। অন্যথায় জালিমদের অন্তর্ভুক্ত হবে।এই বলে আল্লাহ পরীক্ষা করে দেখলেন, হজরত আদম (.) আল্লাহর কথা মানেন নাকি তা ভুলে গিয়ে শয়তানের চক্রান্তে ফেঁসে যান। ইবলিস হজরত আদম এবং তাঁর স্ত্রী হজরত হাওয়া (.)-কে কুমন্ত্রণা দিতে লাগল, ‘তোমরা এই নিষিদ্ধ গাছের ফল খাও। গাছের ফল খেলে তোমরা মানুষ থেকে ফেরেশতায় রূপান্তরিত হবে। ফলে তোমরা কখনোই আর জান্নাত থেকে বের হবে না।হজরত আদম তাঁর স্ত্রী হজরত হাওয়া (.) শয়তানের কুমন্ত্রণার শিকার হয়ে নিষিদ্ধ গাছের ফল খেলেন। সঙ্গে সঙ্গে তাদের শরীর থেকে জান্নাতের পোশাক খসে পড়ল। গাছের পাতা দিয়ে তাঁরা নিজেদের শরীর ঢাকলেন। আল্লাহ হজরত আদম (.)-কে বললেন, ‘আমি তোমাকে বলেছিলাম, গাছের কাছেও না যেতে এবং শয়তানের কথায় কান না দিতে, সে তোমাদের শত্রু। কিন্তু তোমরা তার কথা শুনেছ এবং ফল খেয়ে ফেলেছ। এখন তোমরা জান্নাত থেকে বেরিয়ে পৃথিবীতে চলে যাও এবং সেখানেই বসবাস করো।জান্নাত থেকে বের হয়ে যাওয়া এবং শয়তানের কবলে পড়ার কারণে হজরত আদম (.) খুব দুঃখ পেলেন। দীর্ঘকাল আল্লাহর কাছে কেঁদে কেঁদে ক্ষমা চাইলেন। অবশেষে আল্লাহর দয়া হলো। তিনি হজরত আদম (.)–কে একটি দোয়া শিখিয়ে দিলেন, ‘হে আমাদের রব, আমরা নিজেদের ওপর জুলুম করেছি। যদি আপনি আমাদের ক্ষমা না করেন, তাহলে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হব।হজরত আদম (.) কেঁদে কেঁদে এই দোয়া করতে থাকেন। আল্লাহ অপরিসীম দয়ালু। হজরত আদম (.) তাঁর সন্তানদের অনবরত বোঝালেন, ‘তোমরা কখনো শয়তানের কুমন্ত্রণায় কান দেবে না। সে আমাদের শত্রু। খারাপ কাজের জন্য সব সময় সে আমাদের প্রলুব্ধ করতে থাকে। আর শুনে রাখো, সব সময় আল্লাহর ইবাদত করবে, তাঁর আনুগত্য করবে, সত্য বলবে। কারও ওপর জুলুম করবে না। ভালো কাজে একে অন্যকে সহযোগিতা করবে।আল্লাহর কাছে প্রার্থনার পর হজরত আদম (.) এবং হজরত হাওয়া (.) দুনিয়ায় বসবাস করতে থাকেন। রাতদিন একাগ্রচিত্তে ইবাদতে নিয়োজিত থাকেন। তাঁদের অনেক সন্তানসন্ততি জন্মগ্রহণ করেছিল।

 

নবী-রাসুলদের আগমনের ধারাক্রম :

মুসলিমরা নাম জানা অজানা সব নবী রাসুলকে সত্য বলে বিশ্বাস করে। প্রথম মানব আদম ()-এর মাধ্যমে পৃথিবীতে নবী আগমনের ধারাক্রম শুরু হয় এবং মহানবী মুহাম্মদ (সা.)- এর মাধ্যমে তা শেষ হয়। এখানে উল্লোখ্য যে, যেসব নবী আল্লাহর পক্ষ থেকে শরিয়ত বা

জীবনবিধান লাভ করেছিলেন তাদের রাসূল বলা হয়, আর অন্যদের করা হয় নবী। এভাবে পৃথিবীর প্রথম রাসূল ছিলেন হযরত নূহ (আঃ)

ঐতিহাসিকরা কোরআন-হাদিসে বর্ণিত নবী-রাসুলদের আগমনের একটি ধারাক্রম বর্ণনা করেন। এই ধারাক্রম যতটা না কোরআন-হাদিসনির্ভর, তার চেয়ে বেশি ইতিহাস আশ্রিত। তবে কোরআনের আয়াত থেকেও নবী-রাসুলদের () ধারাক্রম সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

 

আদম (আঃ) : পৃথিবীর প্রথম মানব প্রথম নবী আদম (আঃ) তাঁর মাধ্যমেই নবী আগমনের ধারাক্রম শুরু হয়।

লিশ ইবনে আদম (.): ঐতিহাসিকরা বলেন, আদম ()-এর পর তাঁর পুত্র শিশা নেংকে আল্লাহ নবী মনোনীত করেন। আল্লামা ইবনে কাসির (রহ) বলেন, আদম () মারা যাওয়ার পর তাঁর পুত্র শিশ তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন।' (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়, পৃষ্ঠা: ২৩২)

ইদরিস (.): শিশ ()-এর পর কোন নবীর আগমন হয়েছিল, তা নিয়ে ঐতিহাসিকদের ভেতর মতভিন্নতা রয়েছে। আল্লামা ইবনে কাসির (রহ)-সহ এক দল ঐতিহাসিকের মত হলে, তিনি ছিলেন ইদরিস ()

নুহ (.) : নুহ (.) ছিলেন প্রথম রাসূল। পবিত্র কোরআনের একাধিক স্থানে নূহ ()-এর বর্ণনা এসেছে। তিনি তাঁর মূর্তি পূজারি জাতিকে সাড়ে ১০০ বছর ইসলামের দাওয়াত দেন। কিন্তু খুব সামান্যসংখ্যক মানুষই তা গ্রহণ করে। অতঃপর তাদের অবাধ্যতার জন্য আল্লাহ মহাপ্লাবনের মাধ্যমে সেই জাতিকে ধ্বংস করে দেন। তাদের পরিণতি সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে,আমি নুহকে তার জাতির কাছে প্রেরণ করেছিলাম। সে তাদের মধ্যে ৫০ বছর কম এক হাজার বছর অবস্থান করে। অতঃপর মহাপ্লাবন তাদের গ্রাস করে।

হুদ (.) :নূহ ()-এর পর হুদ (.)-এর আগমন হয়। পবিত্র কোরআনের বর্ণনা থেকেও বোঝা  নূহ (.)-এর পর হুদ (.)-এর জাতির মাধ্যমে পৃথিবীতে নতুন সভ্যতার বিকাশ হয়।

সালেহ (): পবিত্র কোরআনের বর্ণনা থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে হুদ ()-এর জাতির পর সালেহ (.)-এর জাতির আবির্ভাব হয়। ইতিহাসে তারা সামুদ নামে পরিচিত।

ইৰৱাহিম (.): মুসলিম জাতির পিতা ইবরাহিম (.)-এর আগমন সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, “তাদের পূর্ববর্তী নূহ, আদ, সামুদ সম্প্রদায়, ইবরাহিমের সম্প্রদায় এবং মার্দিয়ান বিধ্বস্ত নগরের অধিবাসীদের সংবাদ  সবার কাছে আসেনি”?

এই আয়াতের বিবরণ থেকে ধারণা করা হয়, সামুদ সম্প্রদায়ের পর ইবরাহিম (.)-এর আগমন হয়। তাঁর সম্প্রদায়ের নাম ছিল সার্বিয়া। তারা চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ নক্ষত্রগুলোর পূজা করত। তিনি তাদের একত্ববাদের পথে আহ্বান জানান। কিন্তু তারা তা প্রত্যাখান করে এবং ইবরাহিম খলিলুল্লাহ ()-কে আগুনে পুড়িয়ে মারার ঘৃণ্য স্বতন্ত্র করে। কিন্তু আল্লাহ তাদের স্বতন্ত্র নস্যাৎ করে দেন।

লুত (.): ইবরাহিম (.)-এর যুগেই লুত () প্রেরিত হন। কোরআনের বিবরণ থেকেও বিষয়তি স্পষ্ট হয়। ইরশাদ হয়েছে, লুত তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করুন। ইবরাহিম বলল, আমি আমার প্রতিপালকের উদ্দ্যশ্যে দেশত্যাগ করছি। তিনি পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়"

শোয়াইৰ (.): লুত ()-এর অল্প কিছুদিন পরই শোয়াইব (.) তাঁর দাওয়াতি কার্যক্রম শুরু করেন। কোনো ঐতিহাসিকের দাবি, তিনি ক্যানোডীয় অঞ্চলে আগমন করেন। পবিত্র কোরআনে তাঁর আগমনকাল সম্পর্কে বলা হয়েছে, লুতের জাতি তোমাদের খুব বেশি আগের নয়।

ইসমাঈল (.) : ইবরাহিম () তাঁর স্ত্রী হাজেরা ()-এর ঔরসে জন্ম হয় ইসমাঈল () এর। তিনি পবিত্র কাবাঘর নির্মাণে তাঁর পিতাকে সাহায্য করেন। ইসমাঈল ()-কে আরব জাতির পিতা বলা হয়। তাঁর বংশধররা আরবসভ্যতার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। নবী মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন তাঁর বংশধর।

ইসহাক (.) : ইবরাহিম () তাঁর স্ত্রী সারার ঔরসে জন্ম নেন ইসহাক (আঃ) তাঁর বংশধরদের মধ্য থেকে অসংখ্য নবী রাসূলের আগমন হয়। তাঁদের বেশির ভাগই বনি ইসরাঈলের নারী হিসেবে আগমন করেন।

অবশিষ্ট নবীদের ধারাক্রম: ইসহাক ()-এর বংশধর থেকে আল্লাহ একাধিক নবী প্রেরণ করেন। তাঁদের ধারাক্রম এমন- ইয়াকুব (), ইউসুফ (.), আইয়ুব (.), জুলকিফল (আঃ), ইউনুস (আঃ), মুসা (,), হারুন (.) খিজির () ,ইউশা ইবনে নুন () ইলিয়া স (.) দাউদ (.) সোলাইমান (আঃ) জাকারিয়া (.) ইয়াহইয়া (.) ঈসা (.) এসব নবীর বেশির ভাগ বনি ইসরাঈলের প্রতি প্রেরিত হয়।

এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য, বর্তমান সময়ের ইহুদিরা মুসা . এর অনুসারি এবং খ্রিস্টানরা ঈসা . এর অনুসারি , তারা আরও মনে করে ইহুদি ধর্মের প্রবর্তক মূসা এবং খ্রিস্টান ধর্মের প্রবর্তক ঈসা আঃ মূলত তাদের এই ধরণা সম্পূর্ণ ভুল, কেননা হযরত মুসা এবং ঈসা আঃ অন্যান্য নবী-রাসূলদের মতই ইসলাম প্রচার করেছিলেন। ইসলাম মুসলমানদের দৃষ্টিতে ইহুদি আর খ্রিস্টান ধর্ম একটি ভ্রান্ত মতবাদ ছাড়া আর কিছুই নই।

সর্বশেষ নবী মুহাম্মদ (সা.) : আল্লাহ তাআলা ইসলামের শেষ নবী মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) এর মাধ্যমে নবী-রাসূলের ধারাক্রমের ইতি টানেন। তিনি ছিলেন ইসমাঈল (.)-এর বংশধর। মক্কার কোরাইশ বংশে জন্মগ্রহণ করলেও তিনি কিয়ামত পর্যন্ত আগত সব মানুষের নবী। তাঁর পরে আর কোনো নবী আগমন করবেন না। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, মুহাম্মদ তোমাদের মধ্যে কোনো পুরুষের পিতা নন, তবে তিনি আল্লাহর রাসূল এবং সর্বশেষ নবী। আল্লাহ সব বিষয়ে অবগত।

পরবর্তী চ্যাপ্টারে জানবো পৃথিবীর সর্বোত্তম মানব    হযরত মুহাম্মাদ সা: এর জীবনী এবং ইসলাম।